মুন্সিগঞ্জের জুলাই শহীদ শারিককে নিয়ে লেখা ‘চব্বিশের সেই তরুণ’ মির্জা ফখরুলের হাতে
মোঃ পন্ডিত হোসেন বিশেষ প্রতিনিধি: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া ছাত্রনেতা শারিক চৌধুরী (মানিক মিয়া)-এর জীবন, সংগ্রাম, স্বপ্ন ও আত্মত্যাগের গল্প নিয়ে লেখা জীবনীগ্রন্থ ‘চব্বিশের সেই তরুণ’ তুলে দেওয়া হয়েছে বিএনপির মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর-এর হাতে।
গত ২০ জুন মুন্সিগঞ্জ সার্কিট হাউজে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জেলার অবকাঠামোগত যউন্নয়নসংক্রান্ত মতবিনিময় সভায় শারিকের বাবা আনিস চৌধুরী বইটি বিএনপির মহাসচিবের হাতে তুলে দেন। অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
শহীদ শারিকের ছোট বোন মুক্তা লাল চৌধুরী বইটি রচনা করেছেন। এতে শারিকের ব্যক্তিগত জীবন, শৈশব, পারিবারিক সংগ্রাম, আন্দোলনের নানা স্মৃতি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, পরিবারের সঙ্গে ভাগাভাগি করা কথোপকথন, বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্ট এবং তার আদর্শিক চিন্তাভাবনার নানা দিক স্থান পেয়েছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যারা বইটি সংগ্রহ করতে আগ্রহী তারা শারিকের বাবা আনিস চৌধুরীর (মোবাইল: ০১৯১৭-১০৬৭৮৬ সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবেন।
সংগ্রামী এক তরুণের গল্প
জুলাই শহিদ শারিক চৌধুরী, যিনি মানিক মিয়া শারিক চৌধুরী নামেও পরিচিত, ছিলেন মুন্সিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সদস্য ও
মুন্সিগঞ্জের মিরকাদিম পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব। রাজনীতি সম্পর্কে তার বিশ্বাস ছিল মানুষের কল্যাণ ও সংগ্রামের দর্শনে।
একটি ফেসবুক পোস্টে তিনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্পর্কে লিখেছিলেন—
“এই ব্যক্তিকে আমি একদিন খুব কাছে থেকে দেখেছি। দাঁত নেই কয়েকটি, হাসি দিলে বড্ড সুন্দর লাগে। এই বয়সেও সংগ্রাম করছেন, খাটছেন জেল! তবে আমরা কেন হাপিয়ে যাবো? রাজনীতি আরাম-আয়েশ নয়, মানুষকে ভালো রাখার সংগ্রাম—তীব্র সংগ্রাম।” Politics
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই আদর্শিক বিশ্বাসই তাকে আন্দোলনের সামনের সারিতে নিয়ে গিয়েছিল।
যে স্বপ্ন থেমে গেল ২৬ বছরেই
১৯৯৮ সালের ২২ জুলাই মুন্সিগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন শারিক চৌধুরী। তার বাবা মো. আনিস চৌধুরী এবং মা মরহুম কানিজ রাবেল। মায়ের মৃত্যুর পর পরিবারে নেমে আসে কঠিন সংকট। শারিকের শাহাদাতের প্রায় ছয় বছর আগে তার মা মারা যান।
দুই ভাই ও এক বোনের সংসারে ৫৫ বছর বয়সী বাবা ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্সুরেন্স এ জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
সরকারি তোলারাম কলেজের শিক্ষার্থী শারিক পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি ও ফ্রিল্যান্সিং করে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। বাবার স্বপ্ন ছিল, ছেলে পড়াশোনা শেষ করে পরিবারের হাল ধরবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই আন্দোলনের মিছিলে প্রাণ হারান তিনি।
৫ আগস্টের সেই দিন
কোটা সংস্কার আন্দোলন পরবর্তীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং পরে সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে রূপ নেয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সারাদেশে ঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় অবস্থান নেন শারিক।
পরিবারের বর্ণনা অনুযায়ী, সেদিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ সময় শারিক মাথায় গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয়রা তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুর ১,২৫ মি:দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন এই তরুণ।
অসহায় হয়ে পড়ে পরিবার
শারিকের মৃত্যুর পর তার পরিবার গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে বৃদ্ধ বাবা, ছোট ভাই ও বোন আজও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।
তার ছোট ভাই আহমাদ চৌধুরী (২১) বর্তমানে বিবিএ অধ্যয়ন করছেন। আর ছোট বোন মুক্তা লাল চৌধুরী (১৫) দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
পরিবারের সদস্যরা মনে করেন, ‘চব্বিশের সেই তরুণ’ শুধু একজন শহীদের জীবনী নয়; এটি একটি পরিবারের সংগ্রাম, একজন তরুণের আদর্শ, দেশপ্রেম এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। বইটির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শারিক চৌধুরীর আত্মত্যাগ ও সংগ্রামী জীবন সম্পর্কে জানতে পারবে।
Leave a Reply